বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬ • ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ • সকাল ১০:২৮
কলকাতা সারাদিন সব খবর • সবার আগে
হেডলাইনস

শিক্ষকদের প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে নিষেধাজ্ঞা! ‘ঐতিহাসিক’ সিদ্ধান্ত শুভেন্দু সরকারের, বিকাশের হুঁশিয়ারি ‘হাইকোর্টে বুঝে নেব’

শিক্ষকদের প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে নিষেধাজ্ঞা! শুভেন্দু সরকারের নতুন শর্তে বিতর্ক, হাইকোর্টে যাওয়ার হুঁশিয়ারি বিকাশের

শিক্ষকদের প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে নিষেধাজ্ঞা! ‘ঐতিহাসিক’ সিদ্ধান্ত শুভেন্দু সরকারের, বিকাশের হুঁশিয়ারি ‘হাইকোর্টে বুঝে নেব’
ছবি: কলকাতা সারাদিন • কলকাতা

নতুন শিক্ষক নিয়োগে বড় শর্ত, ভোটে দাঁড়ানো থেকে পুরসভা-বিধানসভায় লড়াই—সবেতেই আসছে বিধিনিষেধ! রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্ত ঘিরে সংবিধান, শিক্ষকদের অধিকার ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা নিয়ে শুরু তীব্র বিতর্ক। পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে নতুন শর্ত ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে শুরু হয়েছে জোরদার তরজা। নবনিযুক্ত শিক্ষক-শিক্ষিকারা আর প্রত্যক্ষ দলীয় রাজনীতিতে অংশ নিতে পারবেন না, এমনকী নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রেও তাঁদের উপর বিধিনিষেধ আরোপের কথা ঘোষণা করেছে রাজ্য সরকার বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। সরকারি স্কুলের পাশাপাশি সরকার-পোষিত ও সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলের ক্ষেত্রেও এই নিয়ম কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে। রাজ্য সরকারের এই সিদ্ধান্তকে ‘ঐতিহাসিক’ বলে ব্যাখ্যা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। কিন্তু সিদ্ধান্তের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আইনজীবী তথা সিপিএম নেতা বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য। তাঁর স্পষ্ট হুঁশিয়ারি, বিধি তৈরি হলে আইনি পথেই তার মোকাবিলা করবেন। অন্যদিকে, শিক্ষকদের অধিকার ও শিক্ষা ব্যবস্থায় রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে আপত্তি তুলেছেন সরকারি কর্মচারী আন্দোলনের নেতারাও। তবে এই ঘোষণার বাস্তব প্রয়োগ কীভাবে হবে, নিয়োগের শর্তে ঠিক কী লেখা থাকবে এবং ইতিমধ্যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত শিক্ষকদের ক্ষেত্রে কী বিধান রাখা হচ্ছে, তা সরকারি বিজ্ঞপ্তি ও বিধির চূড়ান্ত ভাষা থেকেই স্পষ্ট হবে। ### শিক্ষকদের রাজনীতিতে রাশ টানতে চাইছে সরকার? \[শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)\]-র বক্তব্য অনুযায়ী, রাজ্য মন্ত্রিসভার বৈঠকে নবনিযুক্ত শিক্ষক-শিক্ষিকাদের জন্য এই নতুন শর্ত অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। স্কুল সার্ভিস কমিশনের (SSC) নিয়োগ প্রক্রিয়ার সঙ্গেও বিষয়টি যুক্ত করার কথা জানানো হয়েছে। সরকারের যুক্তি, শিক্ষার মান উন্নত করা এবং শিক্ষকতার পেশাগত দায়িত্বকে আরও গুরুত্ব দেওয়ার জন্য এই পদক্ষেপ। রাজ্যে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রভাব, নিয়োগের স্বচ্ছতা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে নতুন শর্তের ঘোষণা শিক্ষা প্রশাসনে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিতে পারে। ঘোষিত বিধিনিষেধ কার্যকর হলে নবনিযুক্ত শিক্ষকরা পুরসভা, কর্পোরেশন, বিধানসভা কিংবা লোকসভা নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না বলে জানানো হয়েছে। অর্থাৎ, শিক্ষকতার পাশাপাশি নির্বাচনী রাজনীতিতে সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ তাঁদের ক্ষেত্রে সীমিত হতে পারে। তবে প্রত্যক্ষ দলীয় রাজনীতিতে অংশ নেওয়া, রাজনৈতিক দলের সদস্য হওয়া এবং নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া—এই তিনটি বিষয় আইনি দিক থেকে এক নয়। নতুন বিধিতে কোন কাজ নিষিদ্ধ হবে, আর কোন ক্ষেত্রে কী ধরনের শর্ত থাকবে, তা স্পষ্ট হওয়া জরুরি। ### পুরনো শিক্ষকদের কী হবে? সরকারের আশ্বাস নতুন নিয়মের ঘোষণা সামনে আসতেই স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন উঠেছে, যাঁরা ইতিমধ্যেই শিক্ষকতার পাশাপাশি সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত, তাঁদের ক্ষেত্রে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে? সরকারের ঘোষণার যে ব্যাখ্যা সামনে এসেছে, তাতে বর্তমান শিক্ষকদের অধিকার খর্ব না করার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ, বিধিনিষেধের মূল লক্ষ্য নবনিযুক্ত শিক্ষক-শিক্ষিকারা—এমনটাই সরকারের অবস্থান বলে জানানো হয়েছে। এখানেই অবশ্য ভবিষ্যতের প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ। নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক এবং আগে থেকে কর্মরত শিক্ষকদের ক্ষেত্রে আলাদা নিয়ম চালু হলে তার আইনি ভিত্তি কী হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। বিশেষ করে নিয়োগের শর্ত, চাকরির বিধি এবং সংবিধানপ্রদত্ত অধিকার—এই তিনটি বিষয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য রাখা রাজ্য সরকারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। সরকারি সূত্রে ঘোষিত সিদ্ধান্তের পূর্ণাঙ্গ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হলে নিয়োগপ্রার্থীদের জন্য কোন শর্ত বাধ্যতামূলক হবে, তা আরও পরিষ্কার হওয়ার কথা। ### ‘বিধি করুন, হাইকোর্টে বুঝে নেব’, হুঁশিয়ারি বিকাশের \[বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য (Bikash Ranjan Bhattacharya)\] এই সিদ্ধান্তের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য, সরকার আগে বিধি তৈরি করুক, তারপর সেই বিধির আইনগত দিক বিচার করা হবে। বিকাশের অভিযোগ, মানুষের স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকার সীমিত করার চেষ্টা কোনওভাবেই সহজে বাস্তবায়িত করা যাবে না। তাঁর মতে, শিক্ষকদের রাজনৈতিক অধিকার খর্ব করার মতো পদক্ষেপের ক্ষেত্রে সংবিধানের প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষকদের প্রত্যক্ষ রাজনীতি নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর যুক্তির প্রসঙ্গেও আপত্তি জানিয়েছেন তিনি। সিপিএম শাসিত রাজ্যগুলিতে শিক্ষকরা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারেন—এই বক্তব্যের প্রেক্ষিতে বিকাশের দাবি, রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও মুক্ত কণ্ঠের প্রশ্নকে অন্যভাবে দেখা উচিত। তবে কোনও নিয়ম অসাংবিধানিক কি না, তা কেবল রাজনৈতিক বক্তব্যের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয় না। সংশ্লিষ্ট বিধির ভাষা, প্রযোজ্য আইন এবং আদালতের বিচারই শেষ পর্যন্ত এই প্রশ্নের নিষ্পত্তি করতে পারে। ### ডিএ মঞ্চের আপত্তি, উঠছে শিক্ষা কমিটির প্রশ্নও \[ভাস্কর ঘোষ (Bhaskar Ghosh)\]-ও রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত নন। ডিএ আন্দোলনের এই নেতার বক্তব্য, শিক্ষাঙ্গনকে রাজনীতিমুক্ত করার লক্ষ্য যদি সত্যিই সরকারের হয়, তাহলে শিক্ষা সংক্রান্ত বিভিন্ন কমিটিতে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের ভূমিকা নিয়েও একইভাবে প্রশ্ন তোলা উচিত। তাঁর মতে, শিক্ষকদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের বিষয়ে প্রচলিত আইন ও বিধির পরিবর্তন না করে শুধু নতুন নিয়োগের ক্ষেত্রে শর্ত আরোপ করা হলে আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে। ভাস্কর ঘোষ আরও মনে করেন, শিক্ষকদের সরকারি কর্মীর মর্যাদা দেওয়ার প্রশ্নটিও আলোচনায় আসা উচিত। তাঁর বক্তব্য, শিক্ষকতার পেশাগত স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হলে সামগ্রিক আইনি কাঠামো বিবেচনা করা দরকার। এই আপত্তি থেকে স্পষ্ট, বিতর্কটি কেবল দলীয় রাজনীতিতে শিক্ষকদের অংশগ্রহণ নিয়ে নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে চাকরির শর্ত, পেশাগত স্বাধীনতা এবং শিক্ষা প্রশাসনের কাঠামোও। ### রাজনৈতিক প্রভাব কতটা? পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষক সমাজের সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শিক্ষক সংগঠন, শিক্ষা নীতি নিয়ে আন্দোলন এবং শিক্ষক প্রতিনিধিদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ—সব মিলিয়ে রাজ্যের রাজনৈতিক পরিসরে শিক্ষকদের ভূমিকা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। নতুন নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অংশগ্রহণে বিধিনিষেধ কার্যকর হলে ভবিষ্যতে শিক্ষক সংগঠনগুলির ভূমিকা এবং রাজনৈতিক দলগুলির শিক্ষক-সমর্থিত সংগঠন গড়ার কৌশলেও প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে চাকরিপ্রার্থীদের কাছে নিয়োগের নতুন শর্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হয়ে উঠবে। এখন নজর সরকারি বিজ্ঞপ্তির দিকে। বিধিনিষেধের পরিধি কতটা, তা সংবিধান ও প্রচলিত আইনের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং আদালতে চ্যালেঞ্জ হলে কী অবস্থান নেয় রাজ্য—সেই প্রশ্নগুলিই আগামী দিনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। শিক্ষার মান ফেরানোর যুক্তিতে সরকারের এই পদক্ষেপ কি নতুন প্রশাসনিক সংস্কারের দিশা দেখাবে, নাকি শিক্ষকদের রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে শুরু হবে দীর্ঘ আইনি লড়াই? বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যের হুঁশিয়ারির পর এখন সেই প্রশ্নেই নজর রাজ্য রাজনীতির।

👁 এই সংবাদটি পড়েছেন ০ জন পাঠক